কোয়ান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কোয়ান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০০৯

কৃত্য-বিড়াল

আধ্যাত্মিক গুরু ও তার শিষ্যসাবুদ যখন সান্ধ্য ধ্যানকৃত্য আরম্ভ করতেন, তখন মঠে থাকা বিড়ালটি এমন গোলমাল শুরু করত যে, তা তাদের চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করে দিত। এ কারণে তিনি সান্ধ্যকৃত্যের সময় বিড়ালটিকে আটকে রাখার নির্দেশ দিলেন। একবছর পর, যখন গুরু প্রয়াত হলেন, তখনো ধ্যানকৃত্যে বিড়ালটিকে আটকে রাখা অব্যাহত রইল। শেষাবধি বিড়ালটি মরে গেলে মঠে আরেকটি বিড়াল আনীত হলো এবং যথারীতি সেটিকেও আটকে রাখা হলো। আর শত শত বছর পর ওই আধ্যাত্মিক গুরুর বিজ্ঞ অনুসারীরা ধ্যানকৃত্যে বিড়াল বেঁধে রাখার ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে রাশি রাশি জ্ঞানপুস্তক প্রণয়ন করলেন।

ঐরাবত ও নীলমাছি

রোশি কাপলিউ একদল মনোবিশ্লেষককে জেন শিখাতে সম্মত হলেন। মনোবিশ্লেষণ শিক্ষালয়ের পরিচালক কর্তৃক দলসদস্যদের সাথে পরিচিত হবার পর রোশি মেঝেতে পাতা একটা গদিতে শান্তভাবে বসে রইলেন। এসময় এক শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে কয়েক ফুট দূরে পাতা আরেকটা গদিতে শিক্ষকের দিকে মুখ করে বসল। ‘জেন কী ?’ ওই শিক্ষার্থী জানতে চাইল। রোশি একটি কলা হাতে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেতে শুরু করলেন। ‘এই-ই সব ? এর বাইরে আমাকে আপনার আর কিছুই দেখাবার নেই ?’, শিক্ষার্থী অনুযোগ করল। ‘দয়া করে আরো কাছে আসো’, শিক্ষক বললেন। শিক্ষার্থী তাই করল। রোশি তখন কলার বাকি অংশ শিক্ষার্থীর মুখের সামনে তুলে ধরলেন। শিক্ষার্থী পুনর্প্রণাম করে স্থান ত্যাগ করল।

আরেকজন শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বলল, ‘আপনারা কি সবাই বুঝেছেন ?’ কোনো সাড়া না-পেয়ে ওই শিক্ষার্থী যুক্ত করল, ‘আপনারা জেনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি উপস্থাপনা প্রত্যক্ষ করলেন মাত্র। আর কারো কি কোনো প্রশ্ন আছে ?’

দীর্ঘ বিরতির পর একজন বলে উঠল, ‘রোশি, আপনার ক্যারিশমায় আমি সন্তুষ্ট নই। আপনি আমাদের সামনে এমন কিছু উপস্থাপন করেছেন, যাতে আমি নিশ্চিত হতে পারি নি যে আমি কিছু বুঝেছি। নিশ্চয়ই আপনার পক্ষে “জেন কী” তা বলা সম্ভব!’

রোশি উত্তর করলেন, ‘আপনারা যদি আমাকে বলতে বাধ্যই করেন, তবে শুনুন। জেন মানে, একটি ঐরাবত একটি নীলমাছিকে লাগাচ্ছে।’

সরাইখানা

এক প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক একদিন এক রাজপ্রাসাদের সদর দরজায় এসে হাজির হলেন। কোনো দ্বাররক্ষকই তাকে থামাবার চেষ্টা করল না। তিনি তার ইচ্ছেমতো ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং সোজা সিংহাসনে আসীন রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

রাজা তৎক্ষণাৎ তাকে চিনতে পেরে বললেন, 'আপনার জন্যে আমি কী করতে পারি ?'

'আমি এই সরাইখানায় খানিক বিশ্রাম নিতে চাই', সাধক বললেন।

রাজা অল্প নাখোশ হলেন এবং বললেন, 'কিন্তু এটা তো কোনো সরাইখানা নয়, এটা আমার প্রাসাদ।'

'আমি কি জানতে চাইতে পারি যে, আপনার আগে এ প্রসাদের মালিকানা কার ছিল ?', সাধকের পালটা প্রশ্ন।

রাজা বললেন, 'আমার পিতার, তিনি ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন।'

সাধক বললেন, 'এবং তার আগে এটি কার মালিকানায় ছিল ?'

'পিতামহের, তিনিও প্রয়াত হয়েছেন।', রাজা জবাব দিলেন।

'তো, যে স্থানে মানুষ সাময়িককাল থাকেন এবং অতঃপর চলে যান, সে স্থানটি একটি সরাইখানা নয় তো কী ?', বললেন সাধক মহোদয়।

অকেজো জীবন

এক কৃষক দিনে দিনে এমনই বুড়িয়ে যান যে, তিনি মাঠের কাজে যোগ দেবার সক্ষমতা পুরোপুরিই হারিয়ে ফেলেন। তিনি তার সময় কাটাতে থাকেন কেবল বারান্দায় বসে থেকে। তার পুত্র মাঠে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখে যে বুড়ো বারান্দায় বসে আছেন তো আছেনই। পুত্র নিজে নিজেই ভাবে, 'বুইড়াডা একদম অকেজো অইয়া গেছে, এরে দিয়া আর কোনো কামকাজ অইব না!'

একদিন খুব নিরাশ বোধ করলে কীসব চিন্তাভাবনা করে সুন্দর একটি কাঠের কফিন বানিয়ে আনে পুত্র। কফিনটিকে ঠেলে ঠেলে সে বারান্দা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ওতে তার বাবাকে উঠে বসতে বলে। বিনাবাক্যব্যয়ে বৃদ্ধ কৃষক কফিনে চড়ে বসেন। ঢাকনা লাগিয়ে পুত্র কফিনটিকে ঠেলতে ঠেলতে মাঠের কোণের উঁচু টিলাতে নিয়ে যায়। যখনই সে কফিনটা ছুড়ে দিতে যাবে, অমনি ভিতর দিক থেকে ঢাকনায় মৃদু একটা টোকা অনুভব করে সে। শব্দ শুনে ঢাকনাটা খুলতেই বৃদ্ধ শান্তিপূর্ণভাবে শুয়ে থেকে তার চোখে চোখ রাখেন। 'আমি জানি অহনই তুমি আমারে টিলা থেইক্যা ছুইড়া দিবা, এই কামডা করনের আগে কি আমি তোমারে একটা অনুরোধ করবার পারি ?' 'কী কবা কও', পুত্র জবাব দিল। 'তুমি যদি চাও তাইলে আমারে ছুইড়া দেও, কিন্তুক সুন্দর এই কাডের কফিনডা ভাইঙ্গো না, কারণ তোমার পুলামাইয়ারও জিনিসটা কামে লাগতারে।'

ভূত তাড়ানো

এক ব্যক্তির স্ত্রী দারুণ অসুখে পড়ে। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে সে তার স্বামীকে জানায়, ‘আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি বলে একদমই তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। আমি চাই না যে তুমিও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো। প্রতিজ্ঞা করো, আমি যদি কখনো মারা যাই, তবে তুমি অন্য কোনো মেয়ের দিকেই কখনো তাকাবে না। তা না হলে কিন্তু আমি ভূত হয়ে ফিরে এসে তোমাকে উচিত শিক্ষা দেব।’

স্ত্রীর মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস পর পর্যন্ত লোকটি অন্য নারীদের প্রতি উপেক্ষা জিইয়ে রাখল। কিন্তু পরে তার একজনের সাথে দেখা হলো এবং সে রীতিমতো তার প্রেমে পড়ে গেল। এক রাতে তাদের মধ্যে বাগদানও সম্পন্ন হয়ে গেল, যা তার পূর্বতন স্ত্রীর প্রেতাত্মার দৃষ্টিগোচর হলো। প্রতিজ্ঞাভঙ্গের দায়ে প্রেতাত্মা তাকে অভিযুক্ত করল এবং এরপর থেকে প্রতিরাতে ভূত হয়ে এসে তাকে বিদ্রূপ করতে লাগল। কোনো নির্দিষ্ট দিনে তার ও তার বাগদত্তার মধ্যে যা যা ঘটত, প্রেতাত্মা তার সব বলে দিত। এমনকি শব্দ ধরে ধরে সেদিন তারা কী কী কথাবার্তা বলেছে না-বলেছে তা একের পর এক তুলে ধরত। কী লজ্জার কাণ্ড! এ ঘটনায় লোকটির এমন মানসিক বিপর্যয় ঘটে গেল যে, সে এমনকি ঘুমানোর সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল।

চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে সে নিকটস্থ এক জেনগুরুর কাছে গিয়ে এর প্রতিকার প্রার্থনা করল। লোকটির কাছে আদ্যোপান্ত ঘটনা শুনে জেনগুরু বললেন, ‘এটি খুবই ধূর্ত ভূত’। ‘ঠিকই বলেছেন’, বলল লোকটি। ‘আমি যা বলি ও করি ভূতটি তার সবই নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারে। এটা সবজান্তা ভূত।’ জেনগুরু মুচকি হেসে বললেন, ‘এরকম একটি ভূতের প্রতি তো আপনার উচ্চধারণাই পোষণ করা উচিত। যাহোক, আবার ওটা এলে আপনাকে কী করতে হবে না-হবে তা আমি বলে দিচ্ছি।’

ওইরাতে ভূতটি এলে জেনগুরু তাকে যেরকম উপদেশ দিয়েছেন, লোকটি তার সাথে সেরকম ব্যবহার করল। সে বলল, ‘তুমি একটা অসাধারণ জ্ঞানী ভূত। তুমি জান যে, তোমার কাছে আমি কোনো কিছুই লুকাতে পারি না। তো, তুমি যদি আমাকে একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পার, তাহলে আজই আমি আমার বাক বা কথা ফিরিয়ে নেব এবং বাকি জীবন একা থাকব।’ ভূত সায় দিয়ে বলল, ‘শুধাও তোমার প্রশ্ন’। লোকটি মেঝেতে রাখা একটা বড়ো ব্যাগ থেকে মুঠোভর্তি করে মটরশুঁটি উঠিয়ে বলল, ‘বল দেখি, আমার হাতে ঠিক কয়টি মটরশুঁটি আছে ?’


ঠিক সেই মুহূর্তেই ভূতটি অদৃশ্য হয়ে যায়, যেটি আর কোনোদিনই ফিরে আসে নি।

একাগ্রতা

ধনুর্বিদ্যায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জনের পর এক দাম্ভিক যুবক দক্ষ তীরন্দাজ হিসেবে সর্বজনবিদিত এক জেনগুরুর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। প্রথম চেষ্টায় একটি দূরবর্তী বৃষের চোখে আঘাত করে ও দ্বিতীয়বারে ওই তীর বিযুক্ত করে সে তার বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতা প্রদর্শন করল। ‘ওইখানে’, যুবকটি বৃদ্ধ জেনগুরুকে বলল, ‘দেখুন তো পাল্লা দিতে পারেন কিনা’! গুরু ধনুক উত্তোলন না-করে ধীরস্থিরভাবে ওই তীরন্দাজ যুবকের প্রতি তাকে অনুসরণ করে পর্বতারোহণ করতে আহ্বান জানালেন। বৃদ্ধ পণ্ডিতের অভীষ্টের প্রতি কৌতূহলবশত যুবকটি তাকে অনুসরণ করে ঊর্ধ্বারোহণ করল, যতক্ষণ না তারা একটি গভীর খাদের নিকটবর্তী হলো ; যেটিতে ছিল একটি দুর্বল গাছের গুঁড়ির কম্পমান সেতু। শান্ত পদক্ষেপে ওই টলটলায়মান ও অতি বিপজ্জনক সেতুর মাঝামাঝি গিয়ে বৃদ্ধ একটি দূরবর্তী গাছকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নিয়ে ধনুক উত্তোলন করলেন এবং সমস্যামুক্তভাবে একটি তীর ছুড়লেন। ‘এবার তোমার পালা’, সাবধানে পশ্চাতাবরোহণের পর নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন। আপাতদৃষ্টে ভীতিপ্রদ, সুগভীর ও ইশারারত অতল গহ্বর দেখে ওই যুবক গাছের গুঁড়িতে উঠে কোনো শক্তিই করতে পারল না, যেজন্য তার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। বৃদ্ধ তার প্রতিযোগীর দুরবস্থা আন্দাজ করলেন এবং বললেন, ‘ধনুর্বিদ্যায় তোমার অনেক দক্ষতা, কিন্তু মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তোমার অত্যল্প, যেজন্য তুমি ব্যর্থ হলে।’

ঘণ্টাগুরু

নবাগত এক শিক্ষার্থী তার অনুশীলনের জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করতে হবে তা জেনগুরুর কাছে সবিনয়ে জানতে চাইল। ‘আমাকে একটা ঘণ্টা ভাবো’, গুরু জবাব দিলেন। বললেন, ‘নরম করে টোকা দাও, মৃদু একটা আওয়াজ পাবে। জোরে আঘাত করো, শুনতে পাবে সুতীব্র, আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও নিনাদময় প্রতিধ্বনি।’

জোড়া খরগোশ

এক শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের কাছে প্রস্তাব করল, ‘মার্শাল আর্ট বিষয়ে আমি পারঙ্গমতা অর্জন করতে চাই। এজন্য আপনার কাছে শেখার পাশাপাশি ভিন্ন শৈলী রপ্ত করতে আমি আরেকজন শিক্ষকের কাছ থেকেও পাঠ নেব বলে ঠিক করেছি।’ তারপর সে এ ব্যাপারে শিক্ষকের অভিমত জানতে চাইল।

‘যে শিকারি একসঙ্গে দুটো খরগোশের পশ্চাদ্বাবন করে, সে দুটোর একটিও ধরতে পারে না।’, শিক্ষক জবাব দিলেন।

কল্পনা

একদা মহান তাও গুরু চুয়াং জু স্বপ্ন দেখলেন যে, তিনি প্রজাপতি হয়ে এদিক-সেদিক পাখা ঝাপটাচ্ছেন। ওই স্বপ্নে তার কোনো ব্যক্তিচেতন ছিল না। তিনি ছিলেন কেবলই একটি প্রজাপতি। সহসাই তিনি জেগে উঠলেন এবং দেখলেন তিনি শুয়ে আছেন, যিনি আবারো একজন ব্যক্তি। তখন তিনি ভাবলেন, ‘আমি কি একজন মানুষ ছিলাম যে কল্পনা করছিল একটি প্রজাপতি হয়ে যাওয়া বিষয়ে, নাকি আমি এখন একটি প্রজাপতি যে কল্পনা করে একজন মানুষ হওয়া বিষয়ে ?’

পুস্তকাদি

একদা এক প্রাজ্ঞ দার্শনিক ও পণ্ডিত নিজেকে জেনচর্চায় নিবেদন করলেন। বহু বছর চর্চায় নিবিষ্ট থেকে যেদিন তিনি চূড়ান্তভাবে আলোকদীপ্ত হলেন, সেদিনই তিনি তার সমস্ত পুস্তকাদি আঙিনায় স্তূপীকৃত করলেন ও পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন।

আত্মবাদ

চীন দেশের তাঙ রাজবংশের প্রধানমন্ত্রী তার বাগ্মিতা ও সামরিক নেতৃত্বে সাফল্যের কারণে একজন জাতীয় বীর হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। কিন্তু খ্যাতি, ক্ষমতা ও প্রাচুর্য সত্ত্বেও তিনি নিজেকে খুবই ব্রাত্য জ্ঞান করতেন এবং একজন ধর্মপ্রাণ সাধারণ বৌদ্ধের মতো জীবনযাপন করতেন। প্রায়ই তিনি তার প্রিয় একজন শিক্ষকের কাছে জেন শিখতে যেতেন এবং দুজন খুব ভালো সময় কাটাতেন। সত্যি বলতে কী, তাদের সম্পর্কের ওপরে প্রধানমন্ত্রিত্বের কোনো প্রভাব প্রতীয়মান হতো না, যেজন্য একজনকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং আরেকজনকে বিনয়ী ছাত্র বলেই মনে হতো।

এরকম এক আড্ডায়, একদিন, প্রধানমন্ত্রী তার শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলেন, ‘মহাত্মন, বৌদ্ধ মতানুযায়ী আত্মবাদ ব্যাপারটা ঠিক কী ?’ শিক্ষকের চোখমুখ মুহূর্তে রক্তবর্ণ ধারণ করল এবং তিনি অত্যন্ত হীনকর ও অপমানজনক স্বরে প্রত্যুত্তর করলেন, ‘এটা কী ধরনের বেয়াদবের মতো প্রশ্ন!’

এই অনাকাঙ্ক্ষিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী খুবই নাখোশ ও ক্রুদ্ধ হলেন। জেনশিক্ষক এরপর মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ‘এই হলো, মান্যবর, আত্মবাদ।’

স্রোতের অনুকূলে

একটি তাও গল্পে একবার একজন বৃদ্ধলোক দুর্ঘটনাবশত নদীতে পড়ে যান, তার পতনস্থানটি ছিল অনেক ঊঁচু থেকে বিপজ্জনকভাবে প্রবাহিত একটি প্রস্রবনের উৎসমুখ। প্রত্যক্ষদর্শীরা তার জীবন নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ল। কিন্তু বিস্ময়করভাবেই তিনি প্রবাহের একেবারে শেষবিন্দু থেকে অক্ষতভাবে উঠে এলেন। লোকজন ছুটে এসে তার কাছে জানতে চাইল যে কীভাবে এরকম অবিশ্বাস্য একটি পরিণতি তার ক্ষেত্রে সম্ভব হলো। ‘জল আমার সঙ্গে নয়, বরং আমিই জলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। ভাবনাচিন্তা না-করে আমি জলের বাঁক-মোচড়ের অনুকূলে মুচড়ে গেছি। ঘূর্ণিতে নিক্ষিপ্ত হয়ে আবার ঘূর্ণির সাথেই বেরিয়ে এসেছি। আমার বেঁচে থাকার রহস্য মোটামুটি এই।’, বৃদ্ধ বিবৃত করলেন।

পবিত্র প্রাজ্ঞজন

পর্বতচূড়ার ছোট্ট কুটিরে বসবাসরত এক প্রাজ্ঞজনের নামে একবার দেশব্যাপী খুব সুনাম ও সুযশ ছড়িয়ে পড়ল। এক গ্রামবাসী সিদ্ধান্ত নিল, সুদীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে হলেও সে তার সাথে দেখা করবে। সে ওই কুটিরে উপনীত হয়ে এক বৃদ্ধ চাকরকে দেখতে পেল, যে তাকে স্বাগত জানাল। ‘আমি পবিত্র প্রাজ্ঞজনের সাথে দেখা করতে চাই।’ বৃদ্ধ চাকর মৃদু হেসে তাকে কুটিরাভ্যন্তরে নিয়ে গেল। গ্রাম থেকে আগত লোকটি হাঁটার সময় অধীর হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল। আকাক্সক্ষা করছিল যে, সে হয়ত সহসাই পবিত্র প্রাজ্ঞজনের মুখোমুখি হবে। কিন্তু তার আগেই সে পেছন দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল এবং তাকে বাইরে নিষ্ক্রান্ত হবার পথ প্রদর্শন করা হলো। তখন সে থামল ও চাকরের উদ্দেশে বলল, ‘কিন্তু আমি তো পবিত্র প্রাজ্ঞজনের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম।’

‘আপনি তো ইতোমধ্যে দেখা করেছেন’, বৃদ্ধ চাকর বলল। ‘জীবনে আপনার যতজনের সাথেই দেখা হবে, এমনকি যদি তারা দেখতে সাদাসিধে ও তুচ্ছ কেউও হন, প্রত্যেককেই একেকজন পবিত্র প্রাজ্ঞজন হিসেবে দেখুন। এটা করলে যে সমস্যায় পড়ে আপনি এখানে এসেছেন, তা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে।’

প্রবুদ্ধ

একদা এক শিক্ষক ঘোষণা দিলেন যে এক তরুণ ভিক্ষু বোধির অগ্রসর স্তরে উপনীত হয়েছেন। এই সংবাদে মঠে যারপরনাই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। ইতঃপূর্বে বোধিপ্রাপ্ত কয়েকজন ভিক্ষু সদ্য বোধিপ্রাপ্ত তরুণ ভিক্ষুর দর্শন লাভ করতে গেলেন। ‘আমরা শুনতে পেলাম আপনি বোধিলাভ করেছেন। কথাটা কি সত্যি ?’ তারা জানতে চাইলেন।

‘সত্যি’, তিনি বললেন।

‘আপনি এখন কেমন অনুভব করছেন ?’

‘চির দুঃখী’, তরুণ ভিক্ষু জবাব দিলেন।

আমি জানি না

এক রাজাধিরাজ, যে কিনা ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ বৌদ্ধ, একবার বৌদ্ধবাদ বিষয়ে প্রশ্ন করতে এক মহান জেনশিক্ষককে প্রাসাদে ডেকে পাঠালেন এবং জানতে চাইলেন, ‘পবিত্র বৌদ্ধ মতাদর্শ অনুযায়ী শিখরতুল্য সত্য কী ?’

‘অসীম শূন্যতা... এবং যার কোথাও কোনো পবিত্রতার চিহ্নমাত্র নেই।’, শিক্ষক জানান দিলেন।

‘যদি কোথাও কোনো পবিত্রতাই না-থাকবে, তাহলে আপনি কে বা কী ?’, রাজাধিরাজ জানতে চাইলেন।

‘আমি জানি না।’, শিক্ষক জবাব দিলেন।

কেটে যাবে

একবার এক শিক্ষার্থী তার ধ্যানশিক্ষকের কাছে গেল এবং বলল, ‘আমার ধ্যানের অবস্থা খুব বাজে! ধ্যানকালে আমি খুব বিক্ষিপ্তচিত্ততা অনুভব করি, অথবা পায়ে লাগাতার ব্যথা করে, অথবা অপরিবর্তনীয়ভাবে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা!’

‘এ অবস্থা থাকবে না, কেটে যাবে’, শিক্ষক নিশ্চিত করে বললেন।

এক সপ্তাহ পরে ওই শিক্ষার্থী আবার তার শিক্ষকের কাছে গেল। বলল, ‘আমার ধ্যানের অবস্থা খুব ভালো! ধ্যানকালে আমি খুব আলোকিত, প্রশান্ত ও সতেজতা বোধ করি! খুবই বিস্ময়কররকম ভালো!

‘এ অবস্থা থাকবে না, কেটে যাবে’, শিক্ষক দৃঢ়ভাবে জানান দিলেন।

মাত্র দুটো শব্দ

একদা এক মঠ ছিল, যেখানকার আচরণবিধি ছিল খুব কঠোর। অঙ্গীকারলব্ধ মৌনব্রত অনুযায়ী ওই মঠে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। তবে এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল এই যে, প্রতি দশ বছর অন্তর ভিক্ষুগণ মাত্র দুটো শব্দ উচ্চারণ করতে পারতেন। মঠে প্রথম দশ বছর অতিক্রান্ত হবার পর এক ভিক্ষু প্রধান ভিক্ষুর কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইতোমধ্যে তো দশ বছর অতিক্রান্ত হলো, আপনি কোন শব্দ দুটো বলবার তাড়না বোধ করছেন ?’

‘বিছানা... শক্ত...’, ভিক্ষু বললেন।

‘ও আচ্ছা’, প্রধান ভিক্ষু জবাব দিলেন।

এর দশ বছর পর ওই ভিক্ষু প্রধান ভিক্ষুর কার্যালয়ে হাজির হলেন। ‘আরো দশ বছর তো অতিক্রান্ত হলো। এবার আপনি কোন শব্দ দুটো বলতে আগ্রহী ?’, জানতে চাইলেন প্রধান ভিক্ষু।

‘খাদ্য... বিস্বাদ...’, ভিক্ষু বললেন।

‘ও আচ্ছা’, প্রধান ভিক্ষু জবাব দিলেন।

আরো দশ বছর অতিক্রান্ত হবার পর ওই ভিক্ষু পুনরায় প্রধান ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি জানতে চাইলেন, ‘এই দশ বছর পর আপনার বলবার শব্দ দুটো কী কী ?’

‘আমি... পরিত্যাগী!’ ভিক্ষু বললেন।

‘ঠিকই হয়েছে। আপনার এরকমই হবার কথা।’ প্রধান ভিক্ষু বললেন, ‘আপনি সারা জীবন যা করেছেন তা হলো কেবল অভিযোগ।’

মাছবিজ্ঞ

চুয়াং জু ও তার বন্ধু একদিন নদীর তীর ধরে হাঁটছিলেন। ‘দেখো দেখো, মাছগুলো কেমন সাঁতার কাটছে। সত্যি ওরা নিজেদের মধ্যে খুব আনন্দফুর্তি করছে’, চুয়াং জু বললেন।

‘তুমি কোনো মাছ নও। কাজেই প্রকৃতপক্ষে তুমি জান না যে তারা নিজেদের মধ্যে খুব আনন্দফুর্তি করছে কি না’, বন্ধুটি টিপ্পনী কাটল।

‘তুমি তো আর আমি নও। সুতরাং তুমি কী করে জানো যে মাছেরা নিজেদের মধ্যে আনন্দ করছে কী করছে না এটা আমি জানি না ?’, বললেন চুয়াং জু।

হবেও বা

দীর্ঘদিন ধরে শস্য উৎপাদনের কাজে যুক্ত ছিলেন এমন একজন কৃষককে নিয়ে একটি তাও গল্প আছে। একদিন ওই কৃষকের ঘোড়াটি দূরে কোথাও উধাও হয়ে গেল। এ সংবাদ শুনে তার কয়েকজন প্রতিবেশী ঘটনা দেখতে এল। সহমর্মিতা জানিয়ে তারা বলল, ‘আপনার কী মন্দ কপাল’! কৃষক জবাব দিলেন, ‘হবেও বা’। পরদিন সকালে ঘোড়াটি আরো তিনটি বন্য ঘোড়া সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। এবার প্রতিবেশীরা এসে উত্তেজনা নিয়ে বলল, ‘কী চমৎকার’! বৃদ্ধ কৃষক জবাব দিলেন, ‘হবেও বা’। পরদিন ওই কৃষকের পুত্র একটি অ-বশ্য বন্য ঘোড়ার পিঠে চড়তে গেলে ঘোড়াটি তাকে ফেলে দিল এবং এতে তার একটি পা ভেঙে গেল। প্রতিবেশীরা এ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আবারো তাদের সহমর্মিতা জানাতে এল। কৃষক এবারও বললেন, ‘হবেও বা’। এর একদিন পর সামরিক বাহিনীর লোকজন তাদের বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে ভর্তির জন্য যুবক ছেলেদের বাছাই করতে এল। তারা ওই যুবকের পা ভাঙা দেখে তাকে উপেক্ষা করে গেল। এবার প্রতিবেশীরা এসে এমন ভালো একটি ব্যাপার ঘটেছে বলে কৃষককে অভিনন্দন জানাল। ‘হবেও বা’, কৃষক জবাব দিলেন।

হাতেকলমে শেখা

একবার এক ঝানু চোরের পুত্র তার বাবাকে ওই পেশার গোপন কলাকৌশল শিখিয়ে দিতে বলল। বৃদ্ধ চোর এতে রাজি হলেন এবং ওই রাতেই পুত্রকে এক বিশাল বাড়িতে চুরি করতে নিয়ে গেলেন। যখন ওই পরিবারের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন তিনি তার চুরিবিদ্যায় আগ্রহী পুত্রকে কিছু কাপড়চোপড় নেবার কথা বলে দিয়ে খুব গোপনে বস্ত্রাদি সজ্জিত আছে এমন একটা ছোট্ট কামরায় ঢুকিয়ে দিলেন, যে কামরা দূর থেকেই বন্ধ করে দেয়া যায়। ছেলেটি মাত্রই কিছু কাপড় কব্জা করেছে, আর অমনি তাকে ভিতরে রেখেই দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দিলেন বুড়ো চোর। এমনকি তিনি ঘরের বাইরে এসে খুব জোরে সদর দরজায় আঘাত করে বাড়ির লোকদের জাগিয়েও দিলেন এবং কেউ দেখে ফেলার আগেই নিজে সটকে পড়লেন। ঘণ্টাখানেক পরে ছেলেটি নোংরা, স্যাঁতসেঁতে ও পরিশ্রান্ত অবস্থায় গৃহে ফিরল। রাগেদুঃখে সে চিৎকার করে বলল, ‘তুমি আমারে ঘরের মধ্যে রাইখ্যা তালা আটকাইয়া দিলা কেন বাজান ? আমি যদি ডরের চোডে আপ্রাণ চেষ্টা না-করতাম, তাইলে কিছুতেই ফইস্কা আইতে পারতাম না। এতে তো আমার সব জানবার-শিখবার শক্তিই মাডে মারা যাইত।’ বুড়ো চোর মুচকি হেসে বললেন, ‘কিন্তুক এর মধ্যে দিয়াই তো তুমি চুরিশিল্পের প্রথম ছবকটা পাইয়া গেলা বাবা।’